এশিয়ান গেমসের মেগা ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানের বিশাল ব্যবধানে সহজেই হারিয়ে ক্রিকেটে সোনা জিতল ভারতীয় মহিলা দল। জাপানের নিশিনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ভারত ২০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে রেকর্ড ২১৬ রান সংগ্রহ করে। জবাবে শ্রীলঙ্কার ইনিংস মাত্র ৬৯ রানে গুটিয়ে যায়। এই অবিস্মরণীয় জয়ে ২০২৩ হাংঝৌ এশিয়ান গেমসের পর টানা দ্বিতীয়বার এই প্রতিযোগিতায় সোনা নিজেদের দখলে রাখল ‘উইমেন ইন ব্লু’।
টসে জিতে ম্যাচের শুরু থেকেই লঙ্কান বোলারদের থিতু হতে দেননি ভারতের দুই নির্ভরযোগ্য ওপেনার স্মৃতি মন্ধনা ও শেফালি বর্মা। পাওয়ারপ্লের ৬ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ৬০ রান তোলে ভারত। শেফালি বর্মা বিশেষ করে স্পিনারদের রিড করে ডাউন দ্য ট্র্যাকে এসে বড় শট খেলেন, অন্যপ্রান্তে মন্ধনা টাইমিংয়ের ওপর ভর করে বাউন্ডারি আদায় করেন।
ওপেনিং জুটিতে মাত্র ৫৯ বলে ৯৯ রান যোগ করে ভারতকে চালকের আসনে বসিয়ে দেন মন্ধনা ও শেফালি। দশম ওভারের শেষ বলে শেফালি বর্মা ৪৮ রানে আউট হলেও স্মৃতি মন্ধনা নিজের বিধ্বংসী রূপ বজায় রাখেন। মাত্র ৩৫ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। মাঠের চারপাশে ৫টি বিশাল ছক্কা ও ৩টি চারে সাজানো তাঁর ৭৯ রানের (৪৫ বল) ইনিংসটি ভারতকে বিশাল সংগ্রহের দিকে নিয়ে যায়। মন্ধনা আউট হওয়ার পর জেমাইমা রদ্রিগেজ এসে ইনিংসের হাল ধরেন।
১৬তম ওভারে ক্রিজে এসে লঙ্কান পেসারদের ক্লাব ক্রিকেটের স্তরে নামিয়ে আনেন উইকেটকিপার-ব্যাটার রিচা ঘোষ। মাত্র ২২ বলে অপরাজিত ৪৯ রানের একটি টর্নেডো ইনিংস খেলেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ৪টি ছক্কা ও ৩টি চার। শেষ ৫ ওভারে ভারতীয় দল স্কোরবোর্ডে যোগ করে আরও ৬২ রান, যার ফলে টি-২০ ফরম্যাটে এশিয়ান গেমসের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২১৬ রানের স্কোর খাড়া করে ভারত।
২১৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভার থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে শ্রীলঙ্কা। লঙ্কান অধিনায়ক চামারি আথাপাত্থু ২১ বলে ২৯ রান করে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা চালান, যার মধ্যে ২টি ছক্কা ছিল। তবে পঞ্চম ওভারে ভারতীয় অফ-স্পিনার দীপ্তি শর্মার বুদ্ধিদীপ্ত ফ্লাইটে লাইন মিস করে তিনি যখন বোল্ড হন, তখনই শ্রীলঙ্কার ম্যাচ জয়ের আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়। পাওয়ারপ্লে-র ৬ ওভার শেষে লঙ্কানদের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৪২ রান।
অধিনায়ক ফেরার পর শ্রীলঙ্কার কোনো ব্যাটারই ভারতীয় স্পিনারদের স্পিন ও বাউন্স সামলাতে পারছিলেন না। দীপ্তি শর্মা নিজের ৪ ওভারের কোটায় মাত্র ৬ রান খরচ করে ৩টি ভাইটাল উইকেট তুলে নেন। মাঝের ওভারগুলোতে রান রেটের চাপ সামলাতে না পেরে লঙ্কান ব্যাটাররা একের পর এক ভুল শট খেলে উইকেট উপহার দিয়ে আসেন।
পেসার শ্রী চারণী এবং পার্ট-টাইম স্পিনার শেফালি বর্মা মিডল ও লোয়ার অর্ডারে জোড়া আঘাত হানেন। শেষ উইকেটে কৌশানি নুথিয়াঙ্গানা (১৪) কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও ১৭তম ওভারে শ্রেয়াঙ্কা পাতিল তাঁকে নিখুঁত ইয়র্কারে বোল্ড করতেই ভারত শিবিরে উৎসব শুরু হয়ে যায়। মাত্র ৬৯ রানে শেষ হয় শ্রীলঙ্কার ইনিংস এবং ভারত ১৪৭ রানের ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয়।
লঙ্কান ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ চামারি আথাপাত্থুকে পাওয়ারপ্লে-র ভেতরেই দীপ্তি শর্মার আউট করাটাই ম্যাচ পুরোপুরি ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। পুরো শ্রীলঙ্কান ইনিংসে ভারতীয় বোলাররা সব মিলিয়ে ৫২টি ডট বল খেলিয়েছেন, যা টি-২০ ক্রিকেটে যেকোনো ব্যাটিং লাইনের কোমর ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এশিয়ান গেমসে মহিলা ক্রিকেটের ফাইনালে এটিই রানের ব্যবধানে (১৪৭ রান) সবচেয়ে বড় জয়। এর মাধ্যমে ভারত এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটে ব্যাক-টু-ব্যাক সোনা জেতার কৃতিত্ব অর্জন করল।
স্বর্ণ জয়ের পর ভারতীয় দলনেত্রী হরমনপ্রীত কৌর বলেন, “টানা দ্বিতীয়বার এশিয়ান গেমসে সোনা জিততে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। এশিয়া কাপের পর মেয়েরা এই ধারা বজায় রেখেছে। স্মৃতি ও শেফালি দারুণ শুরু করে এবং রিচা ইনিংসটি অসাধারণভাবে শেষ করেছে। আমাদের বোলাররা পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন করেছে।”
শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক চামারি আথাপাত্থু বলেন, “ভারতকে অভিনন্দন, ওরা সব বিভাগেই আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। ২১৬ রান তাড়া করা সবসময়ই কঠিন, বিশেষ করে যখন শুরুতেই উইকেট পড়ে যায়। আমাদের ব্যাটিং বিপর্যয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তবে রুপো জিততে পেরে দেশের জন্য গর্বিত।”
ম্যাচের সেরা স্মৃতি মন্ধনা বলেন, “আজকের উইকেটে বল ব্যাটে খুব সুন্দর আসছিল। আমি শুধু নিজের স্বাভাবিক শটগুলো খেলার চেষ্টা করেছি। শেফালির সঙ্গে ওপেনিং পার্টনারশিপটা আমাদের বড় স্কোর গড়ার ভিত তৈরি করে দেয়। দেশের হয়ে সোনা জেতার অনুভূতি সবসময়ই স্পেশাল।”
এশিয়ান গেমস ২০২৬-এ ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একটি আবেগঘন অভিনন্দন বার্তা শেয়ার করেছেন। এই মেগা ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানে হারিয়ে ভারত চলতি গেমসে তাদের প্রথম সোনা অর্জন করে।
প্রধানমন্ত্রী মহিলা ক্রিকেট দলের এই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স, আত্মবিশ্বাস, নিখুঁত দক্ষতা এবং চমৎকার টিমওয়ার্কের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এটি গেমসে ভারতের প্রথম স্বর্ণপদক আনয়ন এবং দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি পুরো স্কোয়াডের জন্য শুভকামনা বার্তা বহন করে। প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি প্রকাশের পর ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা রি-পোস্ট করে ‘উইমেন ইন ব্লু’ ব্রিগেডকে তাঁদের মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য কুর্নিশ জানিয়েছেন।
আসরে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে পাকিস্তান দল।


