ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা কেন নীল জার্সি?

Date:

Share post:

মঞ্চে রাখা আছে বিশ্বকাপ ট্রফি, বিমর্ষ চেহারায় পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষের ছবিটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের চিরন্তন দুঃখগাঁথার অংশ হয়ে গেছে। সেই ম্যাচে তার গায়ে ছিল গাঢ় নীল জার্সি। এই ‘অ্যাওয়ে’ জার্সি গায়ে ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে শেষ সময়ের পেনাল্টি গোলে হেরেছিল দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা। ২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনার বিদায়ের ম্যাচেও ছিল এই জার্সি। কিন্তু এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুঃস্বপ্নের সেই জার্সি গায়েই খেলতে চান মেসিরা! হ্যাঁ, আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের খবর এমনই। যদিও ফিফার পোশাক সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী, এই ম্যাচে এমনিতেও হয়তো ‘অ্যাওয়ে’ জার্সি পরেই খেলতে হতো আর্জেন্টিনাকে। ফিফার নিয়ম হলো, প্রতিটি দল যেন তাদের প্রথম পছন্দের জার্সি পরে খেলে। কিন্তু রঙের সম্ভাব্য সংঘাত দেখা দিলে, একটি গ্রহণযোগ্য রঙের বৈসাদৃশ্য নিশ্চিত করার জন্য তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিশেষ করে, বর্ণান্ধ ভক্তদের স্বার্থে, ফুটবলের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি চেষ্টা করে থাকে একটি গাঢ় ও একটি হালকা রঙের জার্সির বৈসাদৃশ্য নিশ্চিত করতে। সেমিফাইনালে ইংলিশদের গায়ে থাকবে তাদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি। আর্জেন্টাইনদের তাই আকাশী-সাদার পরিবর্তে গাঢ় নীল জার্সিই পরার কথা। তার পরও ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে, সেমিফাইনালে এই জার্সি পরে খেলতে ফিফার কাছে অনুমতি চেয়েছে আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সেই চাওয়ার পেছনের কারণও তুলে এনেছে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম। মূল কারণ, কুসংস্কার! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াই, বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসেই সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত ম্যাচগুলির একটি যেটি, সেই ম্যাচে এই নীল জার্সিই পরেছিল আর্জেন্টিনা দল। সেটি কোন ম্যাচ, নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের যে ম্যাচে দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ‘গোল অব দা সেঞ্চুরি’ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে দিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। ফুটবল ইতিহাসের তুমুল চর্চিত সেই দুই গোল নিয়ে নতুন করে বলার আছে সামান্যই। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শকের সামনে ম্যাচের ৫১ মিনিটে প্রথম গোলটি করেন মারাদোনা। গোলকিপার পিটার শিলটনের সামনে লাফিয়ে উঠে হেড করার জন্য নাগাল না পেয়ে হাতের ঝাপটায় বল জালে পাঠান আর্জেন্টিনার মহানায়ক। ইংলিশদের প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে গোল বহাল রাখেন রেফারি। সেই গোলের রেশ থাকতেই মিনিট চারেক পর আবার চমকে দেন মারাদোনা। এবার পাঁচজনকে কাটিয়ে গোলকিপারকেও এড়িয়ে চোখধাঁঢ়ানো এক গোল করেন তিনি, যেটিকে অনেকেই বলে থাকেন সর্বকালের সেরা গোল। পরে গ্যারি লিনেকার একটি গোল করলেও ইংল্যান্ড আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। হাত দিয়ে করা সেই গোলকে মারাদোনা পরে বলেছিলেন ‘ঈশ্বরের হাত।’ বছরে পর বছর ধরেই সেই গোল নিয়ে কাটাছেঁড়া হয়েছে অনেক। আর্জেন্টাইনরা সেটিকে গর্ব নিয়েই স্মরণ করে, তবে ইংলিশরা সেটিকে এখনও দেখে থাকে জঘন্য এক অপরাধ হিসেবে। আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র ‘ক্রনিকা’ মেসির একটি ছবি দিয়ে বড় করে শিরোণাম করেছে, “আমি তোমাদের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবছিলাম।” এই দেখা ইংল্যান্ডের সঙ্গে মেসির। ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইংলিশদের বিপক্ষে খেলবেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। সংবাদপত্রটি নিজেদেরকেই প্রশ্ন করে, “মেসির কি কোনো কিছুর অভাব আছে?” এবং উত্তরও তারাই দিয়ে দেয়, “হ্যাঁ। ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া।” এরপর সেখানে যোগ করা হয়, “এমন একটি ম্যাচ এটির, যেটির রয়েছে অনেক ইতিহাস এবং দিয়েগো মারাদোনার অবিস্মরণীয় স্মৃতি।” একই জার্সি দিয়ে সেই স্মৃতি ফেরাতে চায় আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গাঢ় নীল জার্সির সুখস্মৃতির শেষ নয় সেখানেই। দুই দল আবার মুখোমুখি হয় ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটির আগেও যথারীতি ছিল তুমুল উত্তেজনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরে আসছিল, ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে বিরোধে দুই দেশের যুদ্ধও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছিল। সেই ম্যাচেও উত্তেজনা ছড়িয়েছিল প্রবলভাবে। দিয়েগো সিমেওনেকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় ডেভিড বেকহ্যামকে। সিমেওনে অভিনয় করে রেফারিকে বিভ্রান্ত করেন, এমন অভিযোগে উঠেছিল তখন। প্রথমার্ধেই চার গোল হওয়া সেই ম্যাচে পরে আর গোল হয়নি। টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনায় কুসংস্কারের প্রভাব ব্যাপক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্মরণীয় দুটি জয়ে যেমন তারা গাঢ় নীল জার্সি পরেছিল, তেমনি আকাশী-সাদা জার্সিতে বিশ্বকাপে ইংলিশদের কাছে হেরেছে ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ২০০২ আসরে। কাজেই জার্সির পছন্দ আর্জেন্টিনার জন্য সহজই ছিল!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

Related articles

অতিরিক্ত সময়ের গোলর কল্যান সমিতি সেমিফাইনালে

অতিরিক্ত সময়ের গোলর কল্যান সমিতি সেমিফাইনালে গেলো। ২-১ গোলে হারালো টাউন ক্লাবকে। নীলজ্যোতি রাখাল শিল্ডের লড়াইয়ে শুরুতে ৩১...

ফাইনালে সদর ‘এ’ খেলবে উদয়পুরের সাথে

রাজ্যস্তরের অনূর্ধ্ব ১৫ ক্রিকেটের ফাইনালে সদর 'এ' খেলবে উদয়পুরের বিরুদ্ধে। ২০ আগস্ট হবে আসরের ফাইনাল ম্যাচ। মঙ্গলবার আসরের...

দ্বিতীয় জয় পেলো লংতরাইভ্যালি

রাজ্যস্তরের সিনিয়র ক্রিকেটের প্লেট গ্রুপে দ্বিতীয় জয় পেলো লংতরাইভ্যালি। ৫৪ রানে হারালো কাঞ্চনপুরকে। এম বি বি স্টেডিয়ামে এম্যাচে...

সেমিফাইনালে উঠলো বিন্দাস বয়েজ

বিলোনিয়ায় ওরিয়েন্টাল ক্লাব আয়োজিত প্রাইজমানি নকআউট ফুটবল প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনালে উঠলো বিন্দাস বয়েজ। তীব্র উত্তেজনা পূর্ণ প্রথম সেমিফাইনালে ইয়ুথ...