ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ হয়েছে বেশি, গোল হয়েছে অনেক বেশি। সংখ্যার আলোয় এইসব স্বাভাবিক ঘটনার মাঝে, পরিসংখ্যানের পাতায় দারুণ কিছু রেকর্ডও লেখা হয়েছে নতুন করে।
ডিক আটফোকাট। সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ (৭৮)। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচের রেকর্ডটা এই আসরে নতুন করে লেখা হয়েছে মোট তিনবার, সেটাও আবার চার দিনের মধ্যে। আসর শুরুর আগে রেকর্ডটি ছিল সাবেক জার্মান কোচ অটো রিহাগেলের। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে গ্রিসের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দায়িত্ব পালনের সময় তার বয়স ছিল ৭১ বছর ৩১৭ দিন। এবার, আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৭৪ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউটেই দাঁড়িয়ে আগের রেকর্ড ভেঙে দেন উগো ব্রুশ। ওই ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা পর, কয়েক মাসের বড় মিরোস্লাভ কৌবেক চেকিয়াদের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে নতুন করে রেকর্ডটি গড়েন। এরপর, সেই রেকর্ড নতুন করে লেখেন আটফোকাট। এই তালিকায় এখন সবার ওপরে আটফোকাট (৭৮ বছর ২৭১ দিন), দুইয়ে মিরোস্লাভ কৌবেক (৭৪ বছর ২৯৬ দিন), তিনে উগো ব্রুশ (৭৪ বছর ৭৯ দিন), চারে কার্লোস কেইরস (৭৩ বছর ১২৪ দিন)। এই আসর শুরুর আগের রেকর্ডধারী অটো রিহাগেল এখন আছেন পাঁচে (৭১ বছর)।
এবারের আগে, বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো দলের দুই জনের সর্বোচ্চ পাঁচটি করে গোলের রেকর্ড ছিল তিন জোড়া সতীর্থের; সান্দর কোচিশ ও ফেরেঙ্ক পুসকাস, জাইরজিনিয়ো ও পেলে এবং রিভালদো ও রোনালদোর। তাদেরকে প্রথমে ছাড়িয়ে যান দুই ইংলিশ তারকা হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম। এবং পরে একই কীর্তি গড়েন দুই ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলে। ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ সাতটি গোল করেছেন বেলিংহ্যাম, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছয়টি কেইন। আর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ ১০ গোল করেছেন এমবাপে, তিনি আসরেরও সর্বোচ্চ গোলদাতা। দেম্বেলে করেছেন ছয়টি।
বিশ্বকাপের আঙিনায় হেলমুট শনকে টপকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ানোর রেকর্ড গড়েছেন দেশম। মায়ের মৃত্যুতে নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অনুপস্থিত থাকার পরও, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে রেকর্ডটি নতুন করে লিখতে পারেন এই ফরাসি। সাবেক জার্মান কোচ হেলমুট চার বিশ্বকাপ মিলে ২৫ ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ানোর আগের রেকর্ডটি গড়েছিলেন। সেটাই এবার ভেঙে দিলেন দেশম। ২৬ ম্যাচ। সবগুলো ম্যাচই ফ্রান্সের হয়ে। ফ্রান্সকে ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার পর, ২০১৮ বিশ্বকাপে শিরোপা জেতান দেশম। এরপর, ২০২২ আসরেও তার কোচিংয়ে ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স, হয় রানার্সআপ। আর এবার তার দল সেমি-ফাইনালে হারের পর হয়েছে চতুর্থ।
বসনিয়া হার্জেগোভিনার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ডেডলক ভাঙতে সুইজারল্যান্ড যখন ভুগছিল, তখন বদলি নামার দুই মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের মাথায় দারুণ গোলে দলকে এগিয়ে নেন মানজাম্বি। পরে আরেকটি গোল করে, সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপের ম্যাচ বদলি খেলোয়াড় হিসেবে জোড়া গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি, ২০ বছর ২৪৭ দিন বয়সে। ভেঙে দেন প্যারাগুয়ের নেলসন কুয়েভাসের আগের রেকর্ড।
আসরের মাঝপথে মিরোস্লাভ ক্লোসার আগের রেকর্ডটি ভেঙে দেন লিওনেল মেসি। পরে সেটা নিজের করে নেন এমবাপে। আসর শুরুর আগে তিন গোলে এগিয়ে ছিলেন ক্লোসা। এবার নিজেদের অভিযান শুরুর ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে তাকে ছুঁয়ে ফেলেন মেসি। পরের ম্যাচেও ছাড়িয়ে গড়েন নতুন রেকর্ড। শেষের দুই দিন আগ পর্যন্ত তার দখলেই ছিল রেকর্ডটা। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে রেকর্ডের নতুন মালিক হন ফরাসি তারকা। এখন সর্বোচ্চ ২২ গোল এমবাপের, এক গোল কম নিয়ে দুইয়ে মেসি।
পরিসংখ্যানের পাতায়ও আসর শুরুর আগে শীর্ষে ছিলেন ক্লোসা। তবে কেবল একটি জয় বেশি নিয়ে। রেকর্ডটি তার হাতছাড়া হওয়ার জোর সম্ভাবনাই ছিল। আর্জেন্টিনাকে টানা সাতটি ম্যাচ জিতিয়ে রেকর্ডটি পরিষ্কার ব্যবধানেই নিজের করে নেন মেসি। ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে ২৩টি জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি, ১৭ জয় নিয়ে দুইয়ে এমবাপে।
টানা ছয় ম্যাচে গোল করে রেকর্ডটির আগের মালিক ছিলেন জুস্ত ফঁতেন ও জাইরজিনিয়ো। তাদের ছাড়িয়ে টানা ৯ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েন মেসি।
দূরপাল্লার শটে সবচেয়ে বেশি গোল করার আগের রেকর্ডটি ছিল ‘দি অ্যাটোমিক কিক’ নামে খ্যাত রিভেলিনোর; ১৯৭০ ও ১৯৭৪ আসর মিলিয়ে পাঁচটি করেছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান। আসর শুরুর আগে বক্সের বাইরে চার গোল নিয়ে তালিকায় দুইয়ে ছিলেন মেসি। ২০১৪ আসরে বসনিয়া, ইরান ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এবং ২০২২ আসরে মেক্সিকোর বিপক্ষে এভাবে গোল করেছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। আর এবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি বক্সের বাইরে থেকে করে নতুন রেকর্ড গড়েন মেসি, পরে জর্ডানের বিপক্ষেও এভাবে করেন একটি।
এবার তৃতৃীয় স্থান নির্ধারণীতে ১০ গোলের পাগলাটে ম্যাচে পরিসংখ্যানের পাতায় অনেক আঁকিবুকি হয়। সেদিনই এই রেকর্ড গড়েন মাইকেল ওলিসে। ১৯৭০ আসরে ‘দা বিউটিফুল টিম’ ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের পথে ছয়টি অ্যাসিস্ট করে রেকর্ডটি গড়েছিলেন পেলে। এবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬-৪ গোলে হারের পথে দুটি অ্যাসিস্ট করে নতুন রেকর্ড (৭) গড়েন ওলিসে। তিনি সর্বোচ্চ পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেন এমবাপের গোলে। কোনো একক খেলোয়াড়ের গোলে অ্যাসিস্ট করার হিসেবেও যা রেকর্ড।
স্পেনের মাঝমাঠের কারিগর রদ্রি এবার নিজের রেকর্ডই ভেঙেছেন, সেটাও অনেকটা বড় ব্যবধানে। ২০২২ আসরে ৬৩৮টি সফল পাস দিয়ে রেকর্ডটি গড়েছিলেন তিনি, সেবার তিনি ভেঙেছিলেন পূর্বসূরি শাভির ২০১০ সালে গড়া ৫৯৯ পাসের রেকর্ড। আর এবার রদ্রি দিয়েছেন ৭৯০টি সফল পাস।
এবার জালে বল পাঠিয়ে প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ছয় আসরে গোল করার রেকর্ড গড়েন রোনালদো। এই তালিকায় পেছনে পড়ে গেছেন তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি; ২০১০ আসরে গোল করতে পারেননি তিনি। প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় রোনালদো, ক্যামেরুনের রজার মিলার পর
একুয়েডরের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে ১৬টি সেভ করেন কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক ইলয় রুম। অনায়াসেই এটা ৯০ মিনিটের ম্যাচের হিসেবে রেকর্ড এবং অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচ মিলিয়ে তিনি স্পর্শ করেন যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ডকে; ২০১৪ আসরে বেলজিয়ামের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে হারের ম্যাচে সমান সংখ্যক সেভ করেছিলেন তিনি। এবারের আসরে দেশ হিসেবেও একটি রেকর্ড গড়ে কুরাসাও। সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা।
অবিশ্বাস্যভাবে স্পেনের শিরোপা জয়ের পথে আট ম্যাচের সাতটিতে জাল অক্ষত রাখেন উনাই সিমন। এক আসরে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে জাল অক্ষত রাখার আগের রেকর্ড ছিল পাঁচটি। পোস্টে সিমন এবং রক্ষণে পেদ্রো পররো, এমরিক লাপোখ্ত, পাউ কুবার্সি ও মার্ক কুকুরেইয়া মিলে যেন অভেদ্য এক দেয়াল গড়ে তুলেছিলেন। এমবাপের ফ্রান্স ও মেসির আর্জেন্টিনার মতো দলের মুখোমুখি হওয়ার পরও, আট ম্যাচ খেলে কেবল একটি গোল হজম করে স্পেন। এতে সবচেয়ে কম গোল খেয়ে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডও গড়ে স্প্যানিশরা।


