তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ফিফার নেতৃত্ব। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে ভুলের জন্য সদস্যদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে ফিফা। মরক্কোতে সংকটকালীন এক বৈঠকের পর সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে সংস্থাটির নেতৃত্ব। একটি নতুন সহায়ক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার এই প্রস্তাবটি তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় এবং গত শুক্রবার তা প্রত্যাহার করা হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা ছিল ফিফার। এই প্রস্তাব উত্থাপন করে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার শিকার ইনফান্তিনো। ফিফার অভ্যন্তর থেকেও ছিল কড়া সমালোচনা ছিল, যা আগামী মার্চে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার পুনঃনির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উচ্চকিত করে তোলে। সংকটকালীন এই বৈঠকের পর ফিফা বিবৃতিতে জানায়, ইনফান্তিনোর ওপর সংস্থাটির আস্থা এখনও অটল। “মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন ফিফার মহাসচিব এবং উপস্থিত ফিফা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। এর জবাবে ফিফা প্রেসিডেন্ট তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ও অসামান্য কাজের জন্য ফিফার মহাসচিব এবং ফিফা প্রশাসনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।” দুটি সূত্র জানায়, মহাসচিব মাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম এই সপ্তাহে কর্মীদের কাছে একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন, যেখানে তিনি সেই ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাক্রমের’ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, যার ফলে প্রস্তাবটি ‘স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত’ হয়েছে। গ্রাফস্ট্রমের চিঠিতে ইনফান্তিনোর নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে যে, “কোনো ব্যক্তি, অস্থির কিছু মুহূর্ত এবং দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটনা আসে এবং যায়, কিন্তু ফিফার কাজ চলতে থাকবে।” তার এই কথাগুলো ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুরের কথারই প্রতিধ্বনি। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন যে, এই পরিকল্পনা নিয়ে ফিফার কর্মীদের ‘প্রতারিত’ করা হয়েছে, যেটিকে তিনি একজন ব্যক্তির প্রকল্প বলে বর্ণনা করেছিলেন। ফিফার বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৬ সাল থেকে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ইনফান্তিনো ছিলেন ‘২১১টি ফিফা সদস্য দ্বারা নির্বাচিত একমাত্র কর্মকর্তা।’ ফিফা জানিয়েছে, ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে এবং বিষয়টি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিফা কাউন্সিল সদস্য ও সদস্য সমিতিগুলোকে একটি পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “এ বিষয়ে একমত হওয়া গেছে যে, ফিফা কাউন্সিল এবং ফিফা সদস্য সংগঠনগুলো যেন এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে বলে মনে না করে, বরং প্রক্রিয়াটি ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।” প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ফিফা বলেছে যে, তারা তাদের “সততা, সুশাসন এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ আর সহ্য করবে না।” এই প্রস্তাবটির সমালোচনার আরেকটি বড় কারণ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কযুক্ত একটি কোম্পানির সম্পৃক্ততাও। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এটি। স্রোত প্রতিকূল বুঝে ইনফান্তিনো পিছু হটলেও সমালোচকরা শান্ত ও আশ্বস্ত হননি। কয়েকটি ইউরোপীয় ফেডারেশন এই ৫৬ বছর বয়সী সুইস-ইতালীয় কর্মকর্তার ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। উয়েফা বলেছে যে, তারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ানে ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থা কনক্যাকাফও একই মত পোষণ করেছে। কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রস্তাবটিকে চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করার পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করেছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। পর্তুগালের সাবেক কিংবদন্তি লুইস ফিগো, যিনি ২০১৫ সালে ফিফা সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করেছিলেন, তিনি বলেছেন যে, এই ঘটনার জেরে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ করা উচিত। উয়েফার ভাইস প্রেসিডেন্ট লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেছন, পরিত্যক্ত প্রস্তাবটিকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ফিফা সভাপতির নেতৃত্বকে একটি সংকটময় মুহূর্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপ জুড়ে ১ হাজার তিনশর বেশি ক্লাবের প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপীয় লীগস বুধবার বলেছে, ফিফাকে এমন “একতরফা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়, যা ক্লাব, খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের প্রভাবিত করে।” ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে ৬৪-তে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাটি পর্যালোচনার জন্য ফিফার দেওয়া চার সপ্তাহের ‘অবাস্তবভাবে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন সময়সীমার’ সমালোচনাও করেছে সংস্থাটি। যদি ৪৩ বা এর বেশি ফিফা সদস্য সংস্থা একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অনুরোধ জানায়, তবে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে একটি বিশেষ কংগ্রেস আহ্বান করা যেতে পারে। এত কিছুর পরও ইনফান্তিনোর অনেক মিত্র রয়েছে এখনও। বিশেষ করে বিশ্বের সেইসব অঞ্চলে, যেখানে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা ও দরিদ্র ফুটবল সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফিফার অনুদানের ওপর নির্ভর করে। আফ্রিকার শীর্ষস্থানীয় ফুটবল প্রশাসকরা সমর্থনে বার্তা পাঠিয়েছেন। এই মহাদেশের ৫৪টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনের দিকে তাকিয়ে আছেন ইনফান্তিনো। আফ্রিকান কনফেডারেশন (সিএএফ) যদিও প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান এখনও নেয়নি আনুষ্ঠানিকভাবে। ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে কম ধনী আঞ্চলিক কনফেডারেশন, ওশেনিয়ার কার্যনির্বাহী কমিটি তাদের অবস্থান ও কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করতে আগামী বুধবার বৈঠকে বসবে। এএফসির সমালোচনামূলক অবস্থান সত্ত্বেও, ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতার, কুয়েত, লেবানন, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন তাদের আনুগত্য ঘোষণা করেছে ইনফান্তিনোর প্রতি। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, র্যাঙ্কিংয়ের সবশেষ দলের ভোটও ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেনের মতো শীর্ষ দেশগুলোর ভোটের মতোই মূল্যবান। ২০৩১ সাল পর্যন্ত নিজের সভাপতিত্বের মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টায় ইনফান্তিনোর জন্য একটি সুস্পষ্ট সুবিধা হলো, মার্চের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো সুস্পষ্ট প্রার্থী এখনও আবির্ভূত হননি। ইনফান্তিনোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তাকে সমর্থনকারী প্রথম ফুটবল সংস্থাগুলোর মধ্যে ছিল মরক্কো, যারা পর্তুগাল ও স্পেনের সাথে যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হবে এবং ফাইনাল ম্যাচটিও আয়োজনের আশা করছে। যদিও ফিফার একজন মুখপাত্র এই প্রতিবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন যে, সমর্থনের বিনিময়ে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি মরক্কোতে আয়োজনের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইনফান্তিনো। “ফিফা সভাপতি ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—এই দাবিটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। যথাসময়ে ফিফা একটি সিদ্ধান্ত নেবে।”


