সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন, এসি মিলান ও ইতালির কিংবদন্তি, ১৯৮২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপের রানার্স আপ দলের তারকা ফ্রাঙ্কো বারেজি মারা গেলেন। সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন ছিলেন তিনি। এসি মিলান ও ইতালির কিংবদন্তি, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইতালির ফুটবলের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি, ১৯৮২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপের রানার্স আপ দলের তারকা ছিলেন ফ্রাঙ্কো বারেজি। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।
এসি মিলান সামাজিক মাধ্যমে জানায়, “ফ্রাঙ্কো বারেজির প্রয়াণে এসি মিলানের সমগ্র ইতিহাস শোকে মুহ্যমান। তার আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই হয়ে থাকবে, ঠিক যেমন তার সেই আইকনিক ৬ নম্বর জার্সিটি।” গত বছর এসি মিলান জানিয়েছিল যে, ফুসফুসের একটি পিণ্ড অপসারণের জন্য বারেজির অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ তাকে আরোগ্য লাভের জন্য চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। ১২ বছর বয়সে এসি মিলানের একাডেমিতে পা রেখেছিলেন বারেজি। ১৭ বছর বয়সে এই ক্লাবের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। গোটা ২০ বছরের ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন সেই আঙিনাতেই। এর মধ্যে নেতৃত্বই দিয়েছেন ১৫ মৌসুমে। সুইপার বা সেন্টার ব্যাক হিসেবে সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট তালিকাতেও রাখতে হবে তাকে। মিলানের হয়ে জিতেছেন তিনি ছয়টি সেরি আ, তিনটি ইউরোপিয়ান (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ), চারটি ইতালিয়ান কাপ, দুটি করে ইউরোপিয়ান সুপার কাপ ও ইন্টারকন্টিন্টোল কাপ। ১৯৯৭ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তার ৬ নম্বর জার্সি তুলে রাখে মিলান। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির ইতিহাসে এই সম্মান পাওয়া প্রথম ফুটবলার তিনিই।
ইতালি জাতীয় দলের হয়েও তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। ১৯৮২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য তিনি, যদিও সেবার কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। তবে ১৯৯০ বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়া ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপের রানার্স আপ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে সেই আসরে তিনিই ছিলেন অধিনায়ক। তবে গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় ম্যাচে চোট পেয়ে পরের ম্যাচগুলোয় খেলতে পারেননি। অবিশ্বাস্যভাবে হাঁটুর অস্ত্রোপচারের ২৫ দিন পর ফাইনালে তিনি মাঠে নেমে ব্রাজিলের বিপক্ষে পুরো ১২০ মিনিট খেলেন তিনি। টাইব্রেকারে অবশ্য গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। ওই বিশ্বকাপের পর স্রেফ আর একবার ইতালির হয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। দেশের হয়ে খেলেছেন মোট ৮১ ম্যাচ। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপ ও তৃতীয় হওয়া স্রেফ সাত ফুটবলারের একজন তিনি। মিলানের প্রতি অনুগত ছিলেন ক্যারিয়ারের একদম শুরু থেকেই। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে দুইবার সেরি বি-তে অবনমনের সময়েও তিনি ক্লাবে ছিলেন এবং উভয় ক্ষেত্রেই তাদের শীর্ষ স্তরে ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। যে যুগে আধিপত্য ছিল শারীরিক শক্তিতে বলীয়ান ডিফেন্ডারদের, সেখানে বারেজি ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। শারীরিক শক্তির সঙ্গে দুর্দান্ত স্কিল ও বোঝাপড়ার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিলেন তিনি। রক্ষণাত্মক কর্তৃত্বের সঙ্গে গভীর থেকে আক্রমণ শুরু করার সক্ষমতাকে এক সুতোয় গেঁথে সুইপারের ভূমিকাকে তিনি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। গতি, শক্তি, একাগ্রতা এবং স্ট্যামিনা মিলিয়ে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ। উচ্চতা ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি হলেও হেডে ছিলেন দারুণ। ‘হাই লাইন ডিফেন্স’ এবং অফসাইড ফাঁদকে নিখুঁত করে তুলেছিলেন তিনি। সেরি আ-তে মিলানের ৫৮ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রার ভিত্তি ছিল সেই কৌশল এবং ফাবিও কাপেলোর দলকে পরিচিতি করে তুলেছিল “গ্লি ইনভিনসিবিলি” (দা ইনভিন্সিবলস) নামে। ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনের বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০ ফুটবলারের তালিকায় তিনি ছিলেন ১৯ নম্বরে। সমর্থকদের ভোটে মিলানের ‘প্লেয়ার অব দা সেঞ্চুরি’ নির্বাচিত হন ১৯৯৯ সালে। ইতালিয়ান ফুটবলের হল অব ফেম-এ জায়গা করে নেন তিনি ২০১৩ সালে। তাকে সবশেষ বড় কোনো আয়োজনে দেখা গেছে গত ফেব্রুয়ারিতে। মিলানে শীতকালীন গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মশালবাহকদের একজন ছিলেন তিনি। ফ্র্যাঙ্কো বারেজির দুই বছরের বড় ভাই জুজেপ্পে বারেজিও ছিলেন ফুটবলার এবং এসি মিলানের প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানের গ্রেট। ডিফেন্ডার ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ইন্টারে খেলেছেন তিনি ১৬ বছর।


