তারকার ভিড়! কিন্তু জ্বললো না একজনও।এক ঝাঁক সমমানের লড়াকুর দাপটে ছিটকে গেল গত দুই বিশ্ব কাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স! নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হলো ইউরোপ চ্যাম্পিয়নরা।ছন্নছাড়া ফ্রান্সকে আবার হারিয়ে ফাইনালে স্পেন।
দারুণ জয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের খেতাবের দৌড়ে এই শিল্পী ফুটবল দেশ। ফাইনালে ওঠার মঞ্চে এসে এতদিনের চেনা পথটা যেন ভুলেই গেল ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে হয়ে গেলেন ভোঁতা, বিপরীতে স্পেন হয়ে উঠল আরও গোছানো। এতে হাইভোল্টেজ লড়াই হয়ে উঠল একপেশে। দিদিয়ে দেশমের দলকে আবার হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল লুইস দে লা ফুয়েন্তের ছেলেরা।
প্রথম সেমিফাইনালে গোছানো ফুটবল খেলে ২-০ গোলের জয়ে শিরোপা লড়াইয়ে পা রাখল স্প্যানিশরা। প্রতিপক্ষের এক অমার্জনীয় ভুলে পাওয়া পেনাল্টিতে দলকে এগিয়ে নেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। পরে দারুণ গোলে ব্যবধান গড়ে দেন ডিফেন্ডার পেদ্রো পররো। এই নিয়ে সাম্প্রতিককালে টানা তিন সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারাল স্পেন। আগের দুইবার – ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ও ২০২৫ সালের উয়েফা নেশন্স লিগে।
২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা দ্বিতীয়বারের মতো উঠল বিশ্বকাপের ফাইনালে। আগামী রবিবার নিউ জার্সির ফাইনালে তারা লড়বে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বিজয়ীদের বিরুদ্ধে।
ষোড়শ মিনিটে প্রতিপক্ষের একটি আক্রমণ রুখে, দ্রুত বল সামনে বাড়ান দেম্বেলে। বল ধরে শুরু হয় এমবাপের দৌড়। মাঝে একমাত্র বাধা তখন পররো, পেছন থেকে পাউ কুবার্সি ও এমরিক লাপোখ্ত ছুটে গিয়ে তিন জন মিলে দলকে বিপদমুক্ত করেন! শুরুর ওই একটি মুহূর্তে ফ্রান্সের ভয়ানক গতির আভাস মিলল ঠিকই; কিন্তু বাকি সময়ে সেটা পূর্ণতা পেল না। তারকাসমৃদ্ধ দল, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যনির্ভর পারফরম্যান্স, এসবের পাশেও আরেকটি দিক ছিল, যেটা প্রথম ছয় ম্যাচে ফ্রান্সকে করে তুলেছিল অজেয়, আর সেটা হলো দলগত পারফরম্যান্স। এদিন এর কোনোটাই দেখা যায় নি! বরং সময়ের সঙ্গে তাদের বিবর্ণতাই আরও বেশি করে ফুটে উঠেছে।
শেষের কয়েক মিনিটের আগে পর্যন্ত ফরাসিদের কোনো প্রচেষ্টা লক্ষ্যেই ছিল না! শেষ কয়েক মিনিটে তাদের কয়েকটি শট ঠিকঠাক লক্ষ্যে থাকলেও, তা আসলে তেমন কোনো রোমাঞ্চ জাগাতে পারেনি। তবে মানতেই হবে, স্প্যানিশদের পরিকল্পনা। তারা সেভাবে খেলতেই দেয় নি এমবাপেদের।
বল দখলে দুই দলই ছিল সমানে-সমান। পরিসংখ্যানের হিসাবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য আক্রমণেও তাই; তবে ম্যাচের পুরোটা সময় ছন্দ খুজে ফিরেছে ফ্রান্স। তাদের ১০ শটের তিনটি ছিল লক্ষ্যে, স্পেনের ১০ শটের দুটি।
এমবাপের ওই শুরুর ব্যর্থ প্রতিআক্রমণের চার মিনিট পরই বক্সে অদ্ভূত এক ফাউল করে পেনাল্টি হজম করেন লুকা দিনিয়ে। বক্সে ডান দিকে উঁচু হয়ে আসা বল ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না লামিন ইয়ামাল, কিন্তু ডিফেন্ডার দিনিয়ে যেন কোনো কিছু না দেখেই ভলি করতে যান এবং মেরে বসেন প্রতিপক্ষের পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। সলিড স্পট কিকে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে নেন ওইয়ারসাবাল। আসরে তার গোল হলো পাঁচটি। আর জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল হলো ৬০ ম্যাচে ৩০টি।
শিরোপা পুনরুদ্ধারের অভিযানে এসে, আসরে সপ্তম ম্যাচে প্রথমবার পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টার আগেই আরেক ধাক্কা আসে। ৩০ মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন উইলিয়াম সালিবা, বদলি নামেন আরেক ডিফেন্ডার মাক্সস লাকোয়া। ৩৮ মিনিটে দুর্দান্ত ওয়ান-টাচ স্প্যানিশ আক্রমণের দেখা মেলে। যার শুরুটা অবশ্য হয় মাইক মিয়াঁর ভুল পাসে। বক্সের মুখ থেকে দানি ওলমোর পাস ডান দিকে পেয়ে ইয়ামাল মাঝে খুঁজে নেন ফাবিয়া রুইসকে। তবে দাইয়ু উপামেকানোর চ্যালেঞ্জে দারুণ পজিশন থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন রুইস। চার মিনিট পর আবার পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে ফরাসিরা। তবে এমবাপে বল পাওয়ার আগে, সময়মতো বক্সের অনেকটা বাইরে এসে ক্লিয়ার করেন উনাই সিমন।
ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যা করতে হতো, দ্বিতীয়ার্ধেও তেমন কিছু করতে পারেনি এমবাপে-দেম্বেলেরা। তাদের পাশাপাশি মাইকেল ওলিসেও এদিন ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষকে সেভাবে সুযোগই দেয়নি রদ্রি, রুইস, ওলমোরা। ৫৮ মিনিটে ফরাসিদের লড়াইয়ে ফেরার আশা একরকম শেষই হয়ে যায়। বক্সের মুখে ওলমোকে বল বাড়িয়ে চোখের পলকে ভেতরে ঢুকে পড়েন পররো, প্রতিপক্ষের বাধায় ঠিকঠাক বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি ওলমো। বল যায় পররোর কাছে এবং নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন এই রাইট-ব্যাক(২-০)। একটু পর দারুণভাবে বক্সে ঢুকে জালে বল পাঠান ইয়ামাল, তবে অফসাইডে ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের আগে জোরাল কোনাকুনি শট নেন এমবাপে, কিন্তু পা বাড়িয়ে বলের গতিপথ পাল্টে দেন কুকুরেইয়া। নির্ধারিত সময়ের আট মিনিট বাকি থাকতে ব্যবধান কমানোর সুবর্ণ এক সুযোগ আসে ফ্রান্সের সামনে। তাদের একটি আক্রমণ রুখতে আবারও বক্সের অনেকটা বাইরে চলে আসেন সিমন। কিন্তু এবার তিনি পারেননি ক্লিয়ার করতে। সেই সময় ফাঁকায় বল পেয়ে যান দেজিরে দুয়ে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে গোলরক্ষক বিহীন পোস্টেও শট নিতে অনেক দেরি করেন পিএসজির এই উইঙ্গার। পরে পজেশনও হারান তিনি! শেষের কয়েক মিনিটে কিছু ভালো সুযোগ অবশ্য আসে দলটির সামনে। কিন্তু এমবাপে যেমন লক্ষ্যভ্রষ্ট ফ্রি-কিকে হতাশা বাড়ান। হতাশার বশেই কিনা, তিনি মাঝে একবার অহেতুক সিমনকে ফাউলও করেন। অন্তিম সময়ে দেম্বেলে বক্সে ভালো পজিশনে বল পান; কিন্তু তার শট রুখে দেন ম্যাচজুড়ে দুর্দান্ত খেলা সিমন।
প্রথম কয়েক ম্যাচের দাপুটে পারফরম্যান্সে চারপাশে আলোচনা শুরু হয়েছিল, এই দুর্বার ফ্রান্সকে আটকাবে কে? গোছানো পারফরম্যান্সে সগৌরবে উত্তরটা দিয়ে দিল দে লা ফুয়েন্তের সেনারা। সেই সঙ্গে পুরোনো এক ধারাও অব্যাহত রইল- র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দলের হাতে সোনালী ট্রফিটি এবারও উঠল না।


