একের পর এক চমক জাগানো নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালেও চমকে দিল। সেই ধাক্কা সামলে, ইংল্যান্ডকে জয়ের পথ দেখালেন জুড বেলিংহ্যাম। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে করলেন জোড়া গোল। তারকা এই মিডফিল্ডারের কাঁধে চেপেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল টমাস টুখেলের দল।
গার্ডেন্সের হার্ড রক স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জয় ২-১ গোলে। প্রথমার্ধে আন্দ্রেয়াস শেলদেরিপকের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল নরওয়ে। আগে কখনোই নকআউট পর্বে কোনো জয় না পাওয়া নরওয়ে এবার ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়। এই দলটিই আসরের শুরু থেকে দারুণ সব পারফরম্যান্সে চমকে দেয় সবাইকে। গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে উঠে শেষ বত্রিশে তারা হারায় আইভরি কোস্টকে। ইউরোপের দলটি এরপর বিদায় করে দেয় রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে!
নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে নেমে, ফেভারিট ইংল্যান্ডেরও চোখে চোখ রেখে লড়াই করে নরওয়ে। পজেশন রাখার পাশাপাশি আক্রমণেও প্রায় সমানে সমান তারা। গোলের জন্য দলটির ১৩ শটের চারটি লক্ষ্যে ছিল, ইংলিশদের ১৪ শটের আটটি থাকে লক্ষ্যে। ম্যাচের শুরুর দিকে চিত্র অবশ্য ভিন্ন ছিল। বল দখলে রাখা ও আক্রমণ, দুইভাবেই শুরু থেকে চাপ তৈরি করে ইংল্যান্ড। প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখলেও, তাদের গোলরক্ষককে অবশ্য তেমন পরীক্ষায় ফেলতে পারছিল না তারা।
প্রথম হাইড্রেশন ব্রেক থেকে ফেরার পরই বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় ইংলিশরা। তবে, বক্সের বাইরে থেকে হ্যারি কেইনের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। প্রথম ২৫ মিনিটে নিজেদের বক্সের বাইরে ব্যস্ত সময় কাটানো নরওয়ে এরপর, একটু একটু করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ৩৪ মিনিটে বক্সে জন স্টোন্সের একটু ভুলে বিপদে পড়তে যাচ্ছিল ইংল্যান্ড। তাদের ভাগ্য ভালো, কাছেই থাকা আর্লিং হলান্ড বল পাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে নেন পিকফোর্ড। পরের মিনিটে দারুণ পজিশনে বল পেয়ে হেড করেন হলান্ড। পাল্টা আক্রমণ শাণানোর চেষ্টায়, প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জে নিজেদের সীমানায় বল হারিয়ে ফেলেন কেইন। এরপর, সতীর্থের পাস ধরে মার্টিন ওদেগোর এগিয়ে যান এবং বল বাড়ান শেলদেরিপকে। ২২ বছর বয়সী এই উইঙ্গার বক্সে ঢুকেই নেন জোরাল শট, প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে পিকফোর্ডের ওপর দিয়ে গিয়ে দূরের পোস্টে লেগে বল জালে জড়ায়। বিশ্বকাপে এটা তার প্রথম গোল। জাতীয় দলের হয়ে ১৮ ম্যাচে তার গোল হলো দুটি। পরের কয়েক মিনিটে আরও কয়েকবার ইংলিশ রক্ষণে চাপ দেয় নরওয়ে। ৪৪ মিনিটে প্রতি আক্রমণে নিশ্চিত সুযোগ পান আলেকসান্দের সর্লথ। বক্সের মুখে তার বাঁ পাশে অরক্ষিত ছিলেন হলান্ড, সামনে ডিফেন্ডার একজন; কিন্তু আতলেতিকো মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড পাস দিতে কিংবা দ্রুত শট নিতেও পারেননি!
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে বেলিংহ্যামের দারুণ নৈপুণ্যে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ইংল্যান্ড। গর্ডনের পাস ধরে বক্সে ঢুকে, প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে জায়গা বানিয়ে জোরাল কোনাকুনি শটে সমতা টানেন রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার। তবে, গোলটি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কারণ, নরওয়ের গোলরক্ষক আরিয়ান হশল নিলাদের গোল কিকে বল মাঝমাঠে হাওয়ায় থাকা অবস্থায় স্কাই ক্যামেরার তারে লাগে, এবং বল ধরে আক্রমণে ওঠে ইংল্যান্ড এবং দুই সতীর্থের পা ঘুরে বল পেয়ে গোলটি করেন বেলিংহ্যাম। গোলের পর নিলাদ, হলান্ড ও নরওয়ের কোচ বিষয়টি নিয়ে রেফারির কাছে আপত্তি জানান, তবে সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। প্রথমার্ধের শেষ সময়ে জালে বল পাঠিয়েছিলেন কেইন; কিন্তু তিনি নিজেই অফসাইডে থাকায় মেলেনি গোল।
দ্বিতীয়ার্ধের দশম মিনিটে কর্নারে গোলমুখে বল পেয়ে জালে পাঠান নরওয়ের ডিফেন্ডার তুরবিয়ন হেইগ্যাম। তবে, কর্নারের আগেই হলান্ড ইংলিশ মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ফাউল করায় এখানেও মেলেনি গোল। দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের পর, প্রতিপক্ষের ওপর বেশ চাপ বাড়ায় নরওয়ে। ভাগ্য সহায় হলে, ৭৫ মিনিটে আবার এগিয়েও যেতে পারতো তারা, কিন্তু ক্রিস্তোফের আয়েরের হেড পিকফোর্ডকে পরাস্ত করলেও বাধা পায় ক্রসবারে। নির্ধারিত সময়ের চার মিনিট বাকি থাকতে গোলমুখে বিপজ্জনক বল বাড়ান বুকায়ো সাকা; কিন্তু প্রতিপক্ষের এবেরেচি এজের পায়ে যাওয়ার আগেই ক্লিয়ার করেন নরওয়ে ডিফেন্ডার। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে গোলরক্ষকের মুহূর্তের ভুলে বিপাকে পড়তে বসেছিল নরওয়ে। কিছুটা সময় নিয়ে যখন শট নেন আরিয়ান হশল নিলাদ, ঠিক ওই সময়ে সামনেই থাকা জেড স্পেন্স পা বাড়িয়ে দেন, বল তার পায়ে লেগে পোস্টের বাইরে যাওয়ায় বেঁচে যায় আসরে চমক জাগানো দলটি।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে কেইনের কোনাকুনি হেড ঝাঁপিয়ে রুখে দেন নিলাদ; কিন্তু দলকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। পরের মিনিটেই তার দুর্বলতার সুযোগেই এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। মর্গ্যান রজার্সের জোরাল শট নাগালে থাকলেও, বল গ্লাভসে নিতে পারেননি গোলরক্ষক, তার হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বল ছুটে গিয়ে জালে পাঠান বেলিংহ্যাম। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল করলেন এই মিডফিল্ডার। আসরে তার মোট গোল হলো ছয়টি। ৯৯ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন স্পেন্স; কিন্তু অস্কার ববের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। তবে ভিএআরের সুপারিশে মনিটরে দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টান তিনি। অতিরিক্ত সময়ের বিরতিতে হলান্ডকে তুলে নেন কোচ স্তলে সুরবাকেন। বদলি নামেন ইয়োর্গেন স্ত্রান্দ লারসেন। শেষ কয়েক মিনিটে মরিয়া হয়ে চেষ্টাও করে নরওয়ে; কিন্তু লড়াইয়ে আর নাটকীয়তা ফেরাতে পারেনি তারা। এই নিয়ে চতুর্থবার কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পার হতে পারল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, ১৯৯০ ও ২০১৮ আসরে সেমিফাইনালে শেষ হয়েছিল তাদের যাত্রা।


