১৬ বছর পর আবার সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরল স্প্যানিশরা। এর সাথে শেষ হলো লিওনেল মেসি অধ্যায়ের সমাপ্তি। আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
প্রতিপক্ষের চাপে পুরোটা সময় কুঁকড়ে থাকলেও, কোনোমতে লড়াই অতিরিক্ত সময়ে টেনে নেয় আজেন্টিনা। তবে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ায়, আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে তারা। এরপর, চাপ আরও বাড়িয়ে, ফেররান তোরেস গার্সিয়ার দারুণ এক ভলিতে আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসবে মেতে উঠল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। স্প্যানিশদের এটি দ্বিতীয় কাপ। জার্সির বুকে লাগবে দ্বিতীয় স্টার।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবার শিরোপা লড়াইয়ে স্পেন জয় পায় ১-০ গোলে। ব্যবধানটা আরো বড় হলে অবাক হওয়ার কারণ থাকত না। স্কোরলাইনে একদমই ফুটে উঠছে না ম্যাচের চিত্র। ১২০ মিনিটের শেষের কিছুটার সময় বাদে, স্পেনের রক্ষণের আশেপাশে একরকম যেতেই পারেনি আর্জেন্টিনা!
লিওনেল মেসিকে নাকি পুরোপুরি আটকে রাখা যায় না – অসম্ভব কাজটি কী দারুণভাবেই না করে দেখাল স্প্যানিশরা। দে লা ফুয়েন্তের কৌশল এতটাই দুর্দান্তভাবে মাঠে প্রয়োগ করলেন রদ্রি-ওলমোরা, তাতে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর সুযোগই পাননি রেকর্ড আটবারের বর্ষসেরা ফুটবলার। ম্যাচের অন্যান্য পরিসংখ্যানে কিছুটা হলেও ফুটে উঠছে স্পেনের দাপট আর আর্জেন্টিনার নাজেহাল অবস্থা। প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ২০টি শট নিয়ে ১২টি লক্ষ্যে রাখতে পারে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ীরা। আর দুটি শট নিয়ে একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা! এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। প্রথমবার জিতেছিল তারা ২০১০ সালে, নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে।
এবার পুরো আসরে স্রেফ একটি গোল হজম করে স্পেন। সবচেয়ে কম গোল খেয়ে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড এটি। প্রথম পাঁচ মিনিটেই দুইবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে নাড়া দেয় স্পেন। নিশ্চিত একবার সুযোগও পায় তারা। তবে, দানি ওলমোর পাস পেয়ে লামিন ইয়ামালের কোনাকুনি শট রুখে দেন গোলরক্ষক। দুই মিনিট পরই পাল্টা আক্রমণে বড় বিপদে পড়তে পারতো স্পেন। সবাইকে ছাড়িয়ে বল প্রায় পেয়ে যাচ্ছিলেন লিওনেল মেসি; তবে সময়মতো বক্সের অনেকটা বাইরে এসে ক্লিয়ার করেন উনাই সিমোন। প্রথম হাইড্রেশন ব্রেক থেকে ফেরার পরই নিজেদের বক্সের সামনে ভুল করে বসেন পাউ কুবার্সি। গোলরক্ষককে দুর্বল ব্যাকপাস বাড়ান তিনি, সেই সুযোগে ছুটে যান মেসি; তবে আবার দ্রুত এগিয়ে ক্লিয়ার করে বিপদ হতে দেননি সিমন। ৩৯ মিনিটে দারুণ সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি মিকেল ওইয়ারসাবাল। বক্সের মুখ থেকে তার শটে তেমন গতি ছিল না, সহজেই আটকান এমিলিয়ানো মার্তিনেস। বিরতির একটু আগে মিকেল ওইয়ারসাবালকে পেছন থেকে ফাউল করে ম্যাচে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। দুই মিনিট পরই তাকে তুলে নেন কোচ।
বিরতির পর ফের আক্রমণ শাণায় স্পেন। এবার যেন তীব্রতা ছিল আরও বেশী। যদিও বক্সের বাইরে থেকে দুর্বল শট নিয়ে মার্তিনেসকে সমস্যায় ফেলতেও পারেননি বায়েনা। কিছুটা সময় পর মাঠে উত্তেজনা ছড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বদলি নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেস মাঝমাঠে অহেতুক পেছন থেকে রদ্রিকে গুতো মারেন। দুই দলের খেলোয়াড়রা সেখানে জড়ো হয়ে তর্কে জড়ায়, তার মাঝেই রেফারির সামনে দানি ওলমোকে ধাক্কা মেরে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস। নির্ধারিত সময়ের ২৮ মিনিট বাকি থাকতে ওইয়ারসাবাল ও ফাবিয়া রুইসকে তুলে ফেররান তরেস ও পেদ্রিকে নামান স্পেন কোচ এবং এর ঠিক পরেই দলকে এগিয়ে নেওয়ার দারুণ সুযোগও পান তরেস। তবে ইয়ামালের ক্রসে তার হেড জমে যায় মার্তিনেসের গ্লাভসে। দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেক পেরিয়ে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু গোলের জন্য কোনো শটই নিতে পারছিল না আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশ কৌশলের সামনে আটকে পড়েছিল তারা। ৭০ মিনিটে দুটি বদল করেন লিওনেল স্কালোনি। রদ্রিগো দে পল ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে তুলে জুলিয়ানো সিমেওনে ও ফাকুন্দো মেদিনাকে নামান কোচ। এতেই কাজ তেমতা হয় নি। দুই মিনিটে পরপর দুটি শট নেয় স্পেন। প্রথমটি ঠেকাতে বেগ পেতে হয়নি মার্তিনেসকে। তবে বক্সের বাইরে থেকে পাউ কুবার্সির শট ঝাঁপিয়ে আটকে দেন মার্তিনেস। চার মিনিট যোগ করা সময়ে বড় আঘাতটা খায় আর্জেন্টিনা; মাঝমাঠে পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এন্সো ফের্নান্দেস। ১০ জনে নেমে আসে দল। এরপরই আক্রমণে উঠে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় স্পেন। লামিন ইয়ামালের দারুণ শট, রক্ষণ প্রাচীর এড়িয়ে পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল, অসাধারণ নৈপুণ্যে ঝাঁপিয়ে আটকান মার্তিনেস। ৯৩ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেড ঠেকিয়ে ব্যবধান ধরে রাখেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। একটু পরই আর্জেন্টিনার বক্সে ঘটনাবহুল মুহূর্তে আলগা বল পেয়ে জালে পাঠান নিকো, তবে তার আগেই নিকোলো ওতামেন্দি ফাউলের শিকার হওয়ায় গোল মেলেনি।
কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালের সুপার সাব মিকেল মেরিনো এখানেও বদলি নেমে ব্যবধান গড়ে দিতে পারতেন। অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে ভালো পজিশনে সতীর্থের ক্রস পান তিনি, তবে তার হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যে থাকেনি। অসংখ্য সুযোগ হারানোর পর, দুই বদলি খেলোয়াড়ের নৈপুণ্যে ১০৬তম মিনিটে জালের দেখা পায় স্পেন। পেদ্রো পররো দূরের পোস্টে নিকো উইলিয়ামসের উদ্দেশ্যে ক্রস বাড়ান, তাকে আটকাতে এগিয়ে যান মার্তিনেস, সেই সুযোগে হেডে কাটব্যাক করেন নিকো এবং ছুটে গিয়ে জোরালি শটে ঠিকানা খুঁজে নেন তরেস। খানিক পর পাল্টা আক্রমণে উঠে আবার জালে বল পাঠান তরেস, তবে নিজেই অফসাইডে ছিলেন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড। কোণঠাসা আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে প্রয়োজন ছিল মেসির জাদু। ১১৫ মিনিটে তেমন কিছু হতেও যাচ্ছিল। অনেকটা দূরে ডান দিক থেকে ক্রস বাড়ান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক, হাওয়ায় বাঁক নিয়ে বল দূরের পোস্টে ক্রসবার ঘেঁষে পড়ে ওপরের জালে। শেষ সময়ে মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনাও, স্পেনও মনোযোগ দেয় ব্যবধান ধরে রাখায়। পরপর তিনটি কর্নার পায় আর্জেন্টাইনরা। শেষটিতে পেনাল্টি স্পটের কাছে ফাঁকায় বল পেয়ে যান জুলিয়ানো সিমেওনে; কিন্তু উড়িয়ে মেরে কেবল হতাশাই বাড়ান আতলেতিকো মাদ্রিদের মিডফিল্ডার।
এরপরই বাজে শেষের বাঁশি, নিউ জার্সি থেকে মাদ্রিদ, সবখানে উল্লাসে ফেটে পড়েন স্পেন সমর্থকরা। আর শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নটা ভেস্তে যাওয়ার হতাশায় মলিন হয় মেসি, মার্তিনেসদের। হারের হতাশায় মেজাজ হারিয়ে ফেলেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস। অযথা প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে দেখেন লাল কার্ড। এই ম্যাচ দিয়েই হয়তো শেষ হয়ে গেল লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আট গোল করে আসর শেষ করলেন দুইবারের গোল্ডেন বল জয়ী কিংবদন্তি।
মেসি অধ্যায়ের সমাপ্তি, আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন
Date:
Share post:


