বিশ্বকাপের আসরে এ পর্যন্ত খেলা চার ম্যাচে ফ্রান্সের পাওয়া ১৩ গোলের ১২টির সাথেই জুড়ে আছেন চার ফরোয়ার্ড। কিলিয়ান এমবাপের গোল ছয়টি, উসমান দেম্বেলের চারটি, ব্রাডলে বার্কোলার দুইটি। অন্য গোলটি দিজিরে দুঁয়ের। মাইকেল ওলিসে এখনও পাননি জালের দেখা। তবে, পাঁচ অ্যাসিস্ট করে তিনিও এখন দারুণ কীর্তি গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড এখনও পেলের। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ছয়টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন এই কিংবদন্তি। আর একটি গোলে অবদান রাখতে পারলেই তাকে ছুঁয়ে ফেলবেন ওলিসে। উত্তর আমেরিকা আসরে দুর্বার গতিতে ছোটা ফ্রান্সের আক্রমণভাগের সামর্থ্য নিয়ে ভিন্ন এক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা আক্রমণভাগ এই ফ্রান্সেরই কিনা। গত চার ম্যাচে এমবাপে, ওলিসেদের আধিপত্য, গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দেখাচ্ছে, এই তর্ক বা তুলনা ওঠা অস্বাভাবিক নয় মোটেও। এ পর্যন্ত এমবাপে, দেম্বেলে ও ওলিসে – এই তিন জন ১১ গোল এবং ৯টি অ্যাসিস্টের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কম যাননি ব্রাডলেও; তিনিও গোল করেছেন দুটি, অ্যাসিস্ট একটি। অথচ, দিদিয়ে দেশম আক্রমণভাগে ব্রাডলের শুরু থেকে খেলার নিশ্চয়তাই নেই! বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দলের আক্রমণভাগে এমন সমন্বয় বিরল। সবশেষ যে ত্রয়ী এক আসরে সবচেয়ে বেশি গোল উপহার দিয়েছিল, সেটি ব্রাজিলের। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো মিলে, ২০০২ বিশ্বকাপে করেছিলেন ১৫ গোল। ‘দ্য ফেনেমেনোন’ রোনালদোর গোল ছিল আটটি, রিভালদোর পাঁচটি ও রোনালদিনিয়োর দুইটি। সেবার পঞ্চম ও সবশেষ বিশ্বকাপটি জিতেছিল ব্রাজিল। এই আক্রমণভাগের কাঁধে সওয়ার হয়ে ফ্রান্স সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছুতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু এরই মধ্যে এমবাপে, ওলিসে, দেম্বেলেরা সেই আলোচনায় উঠে এসেছেন, যে আলোচনা মূলত এতদিন হতো ১৯৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিল এবং ১৯৫৪ আসরে হাঙ্গেরির সেই চমৎকার দল নিয়ে। এবারে শেষ বত্রিশের ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর, ফরাসি মিডফিল্ডার অহেলিয়া চুয়ামেনির কথাতেও উঠে এলো তাদের অ্যাটাকিং লাইন-আপের সামর্থ্য, “আমাদের আক্রমণভাগের সামর্থ্য যখন দেখবেন…এটা, এমনকি ফুটবল ইতিহাসেই খুবই বিরল।” একটুও বাড়িয়ে বলেননি চুয়ামেনি। এমবাপে গতির তীব্রতায় প্রতিপক্ষের রক্ষণে কাপঁন ধরাতে পারদর্শী, দেম্বেলে অননুমেয়, মুহূর্তের মুভে চিড় ধরিয়ে দিতে পারেন প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়ালে। ওলিসে সৃষ্টিশীল; দূরদৃষ্টি এবং চূড়ান্ত পাসটি দিয়ে তিনি সবাইকে গেঁথে রাখেন এক সুতোঁয়। একটা করে ম্যাচ গড়াচ্ছে, এই তিন জনের বনিবনা, বোঝাপড়া দৃঢ় হচ্ছে আরও। কেবল পাঁচটি অ্যাসিস্ট করাই নয়, এমবাপের সঙ্গে ওলিসে গড়ে তুলেছেন দারুণ এক জুটি। তাদের জুটিতে এসেছে ছয়টি গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জুটি হিসাবে এমন কীর্তি নেই আর। ফ্রান্স কোচ দিদিয়ে দেশম তো বলেই দিয়েছেন, ওলিসেও সেরাদের কাতারে থাকার যোগ্য। “ওলিসে ওই কাতারেই পড়ে। কিলিয়ান অনেক আগে থেকেই ওই ক্যাটাগরিতে আছে। কিন্তু বায়ার্ন মিউনিখে ওলিসে যা করেছে, আমাদের হয়ে যা করতে সক্ষম, তাতে হ্যাঁ, সে ওই কাতারে থাকার জন্য, ঠিক যেমনটা উসমানও”। আরও বলেন, “আমাদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া চমৎকার। কেবল মানুষ হিসেবে তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক, এমন নয়, তারা একই ফুটবলের ভাষায় কথা বলে এবং এ কারণে, সবকিছু সঠিক দিকে এগোয়।” এমবাপে, দেম্বেলে, ওলিসেকে নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও, ফ্রান্সের আক্রমণভাগে যোদ্ধার আসলে কমতি নেই। তাদের শক্তি সেরা একাদশে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, লেফট উইংয়ে ভাগাভাগি করে খেলতে খেলতেই বার্কোলা দুই গোল করেছেন, দুয়ে করেছেন একটি। এই দুজনের সাথে আছেন হায়ান শেহকি; বেঞ্চে থেকে মাঠে নেমে মুহূর্তেই গতিপথ বদলে দিতে পারেন তিনি। এছাড়া জ্যাঁ ফিলিপ মাতেতা আছেন। প্রিমিয়ার লিগে গত মরশুমে ১২ গোল করা এই ফরোয়ার্ড খুব কমই খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। সেরি আয় এবার ১৩ গোল করে আসা মার্কাস থুরামকে নিয়েও আলোচনা হচ্ছে না তেমন একটা। তবে, সুযোগ পেলে তিনিও নিংড়ে দিচ্ছেন সামর্থ্যের সবটুকু। সম্ভবত, ফরাসি কোচের সবচেয়ে শক্তির জায়গা, বল পায়ে থাকার পাশাপাশি না থাকা অবস্থাতেও আক্রমণভাগের সবাই সমান সক্রিয় এবং পরিশ্রমী। এমবাপে-দুয়েদের তিনি তৈরি করেছেন সেভাবেই। অধিনায়কের প্রশংসা করতে গিয়ে দেশও তুলে ধরলেন, দলীয় প্রচেষ্টায় গুরুত্ব দেওয়ার দিকটি। “সবকিছুর আগে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ, এবং কিলিয়ান, অধিনায়ক হিসেবে, এর সেরা উদাহরণ। আমি বুঝি, কেউ কেউ পর্যাপ্ত সময় খেলতে না পেরে বা একেবারেই খেলতে না পেরে হতাশ হতে পারে। হতাশা থাকবেই, কিন্তু টিম স্পিরিট থাকতে হবে। যদিও, শুধু এটা দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না, কিন্তু আমি খুব ভালো করে জানি, টিম স্পিরিটের অভাবে আপনি হেরেও যেতে পারেন।”
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা আক্রমণভাগ ফ্রান্সের
Date:
Share post:


